Saturday, January 21, 2017

গ্যালারী

 


সূফীবাদ কি ???

সুফিবাদ (সুফিবাদ বা সুফি দর্শন, আরবি- সুফিয়াত বা তাসাউফ) একটি ইসলামি আধ্যাত্মিক দর্শনআত্মা সম্পর্কিত আলোচনা এর মুখ্য বিষয়। সুফিবাদের একমাত্র মূল বিষয়টি হল, আপন নফসের সঙ্গে, নিজ প্রাণের সাথে, নিজের জীবাত্মার সাথে পরমাত্মা আল্লাহ যে শয়তানটিকে আমাদের পরীক্ষা করার জন্য দেওয়া হয়েছে তার সাথে জিহাদ করে তার থেকে মুক্ত হয়ে এ জড় জগত থেকে মুক্তি পাওয়া। আত্মার পরিশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনই হল এই দর্শনের মর্মকথা। পরম সত্তা মহান আল্লাহ কে জানার এবং আকাঙ্ক্ষা মানুষের চিরন্তন। স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে আধ্যাত্মিক ধ্যান ও জ্ঞানের মাধ্যামে জানার প্রচেষ্টাকে সুফি দর্শন বা সুফিবাদ বলা হয়

হযরত ইমাম গাজ্জালি (র.) এর মতে, আল্লাহর ব্যতীত অপর মন্দ সবকিছু থেকে আত্মাকে প্রবিত্র করে সর্বদা আল্লাহর আরাধনায় নিমজ্জিত থাকা এবং সম্পূর্ণ রূপে আল্লাহুতে নিমগ্ন হওয়ার নামই সুফিবাদ বলে। ‘সুফ অর্থ পশম আর তাসাওউফের অর্থ পশমী বস্ত্রে পরিধানের অভ্যাস (লাব্‌সু’স-সুফ) - অতঃপর মরমীতত্ত্বের সাধনায় কারও জীবনকে নিয়োজিত করার কাজকে বলা হয় তাসাওউফ। যিনি নিজেকে এইরূপ সাধনায় সমর্পিত করেন ইসলামের পরিভাষায় তিনি সুফি নামে অভিহিত হন।’ ইসলামি পরিভাষায় সুফিবাদকে তাসাওউফ বলা হয়, যার অর্থ আধ্যাত্মিক তত্ত্বজ্ঞান। তাসাওউফ বা সুফিবাদ বলতে অবিনশ্বর আত্মার পরিশুদ্ধির সাধনাকে বুঝায়। আত্মার পবিত্রতার মাধ্যমে ফানাফিল্লাহ (আল্লাহর সঙ্গে অবস্থান করা) এবং ফানাফিল্লাহর মাধ্যমে বাকাবিল্লাহ (আল্লাহর সঙ্গে স্থায়িভাবে বিলীন হয়ে যাওয়া) লাভ করা যায়। যেহেতু আল্লাহ নিরাকার, তাই তাঁর মধ্যে ফানা হওয়ার জন্য নিরাকার শক্তির প্রতি প্রেমই একমাত্র মাধ্যম। তাসাওউফ দর্শন অনুযায়ী এই সাধনাকে ‘ তরিকত ’ বা আল্লাহ-প্রাপ্তির পথ বলা হয়। তরিকত সাধনায় মুর্শিদ বা পথপ্রদর্শকের প্রয়োজন হয়। সেই পথ হলো ফানা ফিশ্‌শাইখ, ফানা ফিররাসুল ও ফানাফিল্লাহ। ফানাফিল্লাহ হওয়ার পর বাকাবিল্লাহ লাভ হয়। বাকাবিল্লাহ অর্জিত হলে সুফি দর্শন অনুযায়ী সুফি আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ শক্তিতে শক্তিমান হন। তখন সুফির অন্তরে সার্বক্ষণিক শান্তি ও আনন্দ বিরাজ করে। সুফিগণের মতে, হযরত মুহাম্মাদ (সা.) স্বয়ং সুফিদর্শনের প্রবর্তক। এর সপক্ষে সুফিগণ মুহাম্মাদ (সা.) এর একটি হাদিস উল্লেখ করেন যা হল, মানবদেহে একটি বিশেষ অঙ্গ আছে, যা সুস্থ থাকলে সমগ্র দেহ পরিশুদ্ধ থাকে, আর অসুস্থ থাকলে সমগ্র দেহ অপরিশুদ্ধ হয়ে যায়। জেনে রাখো এটি হলো কল্‌ব বা হৃদয়। আল্লাহর জিকর বা স্মরণে কল্‌ব কলুষমুক্ত হয়। সার্বক্ষণিক আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে কল্‌বকে কলুষমুক্ত করে আল্লাহর প্রেমার্জন সুফিবাদের উদ্দেশ্য। যাঁরা তাঁর প্রেমার্জন করেছেন, তাঁদের তরিকা বা পথ অনুসরণ করে ফানাফিল্লাহর মাধ্যমে বাকাবিল্লাহ অর্জন করাই হলো সুফিদর্শন।

সুফিবাদ উৎকর্ষ লাভ করে পারস্যে। সেখানকার প্রখ্যাত সুফি-দরবেশ, কবি-সাহিত্যিক এবং দার্শনিকগণ নানা শাস্ত্র, কাব্য ও ব্যাখ্যা-পুস্তক রচনা করে এই দর্শনকে সাধারণের নিকট জনপ্রিয় করে তোলেন। কালক্রমে বিখ্যাত ওলিদের অবলম্বন করে নানা তরিকা গড়ে ওঠে। সেগুলির মধ্যে কয়েকটি প্রধান তরিকা সর্বাধিক প্রসিদ্ধি লাভ করে:


  • গাউসুল আজম বড় পির হযরত আবদুল কাদির জিলানি (র.) প্রতিষ্ঠিত কাদেরিয়া তরিকা
  • সুলতানুল হিন্দ হযরত খাজা মু’ঈনুদ্দিন চিশতি (র.) প্রতিষ্ঠিত চিশতিয়া তরিকা
  • গাউসুল আজম হযরত আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারি (ক.) ও গাউছুল আযম গোলামুর রহমান মাইজভান্ডারি (ক.) প্রতিষ্ঠিত মাইজভান্ডারিয়া তরিকা
  • হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দী (র.) প্রতিষ্ঠিত নকশবন্দিয়া তরিকা
  • হযরত শেখ আহমদ মুজাদ্দিদ-ই-আলফে সানি সারহিন্দি (র.) প্রতিষ্ঠিত মুজাদ্দিদিয়া তরিকা
  • এছাড়া সুহ্‌রাওয়ার্দিয়া, মাদারিয়া, আহমদিয়া ও কলন্দরিয়া নামে আরও কয়েকটি তরিকার উদ্ভব ঘটে।

তাসাউফ বনাম সুফিবাদ ঃ 


ঐতিহাসিকভাবে, মুসলমানরা সুফিদের আধ্যাত্বিক সাধনাকে প্রকাশ করার জন্য তাসাউফ শব্দটি ব্যবহার করত। ঐতিহাসিক সুফিদের মতে, তাসাউফ ইসলামের একটি বিশেষ রূপ যা ইসলামিক শরীয়াহ আইন এর অনুরূপ। তাদের মতে, বিশ্বের সকল প্রকার মন্দ এবং গির্হত কাজ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য শরীয়াহ এই বিশ্বকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। তারা মনে করেন, তাসাউফ ইসলামের অবিচ্ছেদ্য এবং ইসলামিক বিশ্বাস এবং অনুশীলনের অপরিহার্য অংশ। কার্ল এর্নস্ট এর মতে, সুফিবাদ শব্দটি কোন ইসলামিক গ্রন্থ বা কোন সুফিদের কাছ থেকে আসেনি। তার মতে শব্দটি এসেছে প্রাচ্যের ভাষা বিষয়ক বিট্রিশ গবেষকদরে থেকে। ইসলামিক সভ্যতায় (ইসলামিক আধ্যাত্বিকতা) তারা যে মনোমুগ্ধকর বিষয় উপলব্ধি করেন এবং তৎকালীন যুক্তরাজ্যে ইসলাম সম্বন্ধে নেতিবাচক ধারণা বা বিশ্বাস বিরাজ করছিল তার মধ্যে কৃত্রিম পার্থক্য সৃষ্টি করতে তারা সুফিবাদ শব্দটি ব্যবহার করেন।


শাজড়া মোবারক

Thursday, January 12, 2017

সাজ্জাদানশীন

গাউছুল আজম হযরত সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (কঃ) এর উত্তরাধীকারীঃ গাউছুল আজম হযরত সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (কঃ) ওফাতের পূর্বে আপন নাতী হযরত সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভান্ডারী (কঃ) কে বালেগ ঘোষনা করে মাইজভান্ডার দরবার শরীফে আধ্যাত্মিক উত্তরাধীকারী নীর্ধারন করে যান। হযরত কেবলা (কঃ) এই প্রসঙ্গে বলেন, “আমার ‘দেলা ময়না’ বালেগ। দেলা ময়না গদীতে বসবে”।
বর্তমান পীরে ত্বরিকত ও সাজ্জাদানশীনঃ হযরত সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভান্ডারী (কঃ) পীর হওয়ার জন্য খেলাফতপ্রাপ্ত হওয়ার শর্তের প্রবক্তা ছিলেন। তার দৃষ্টিতে যিনি আপন পীর সাহেবের কাছ থেকে সরাসরি ও স্পষ্টভাবে খেলাফত পাননি তিনি কাওকে বায়াত দেওয়ার যোগ্য নন।
খেলাফত প্রদানপূর্বক সাজ্জাদানশীন মনোনয়ন এর মাধ্যমে গাউছিয়ত জারী রাখার নিয়মের অনুসরণে হযরত সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভান্ডারী (কঃ) তাঁর জীবদ্দশায় তদীয় তৃতীয় পুত্র হযরত সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভান্ডারী (মঃ জিঃ আঃ) কে নিজ গদীর উত্তরাধীকারি ও মাইজভান্ডার দরবার শরীফের সাজ্জাদানশীন সাব্যস্ত করে যান।
তিনি শাহ সুফী হযরত সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভান্ডারী (মঃ জিঃ আঃ) কে সাজ্জাদানশীনের দায়িত্ব অর্পনের বিষয়টি জরুরি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও তাঁর লিখিত ‘মানব সভ্যতা’ নামক বইয়ের ভূমিকাংশে তিনি উল্ল্যেখের মাধ্যমে প্রামান্য করেন।
‘মানব সভ্যতা’ নামক বইয়ের ভূমিকাংশে তিনি উল্ল্যেখ করেন, “ অত্র বইটি আমার জীবন সায়াহ্নে ছাপাইয়া যাইতে পারিব কিনা তা ভবিতব্য খোদাই তাহা ভাল জানেন। তাই বইটি ছাপাইবার জন্য আমাদের প্রচলিত “আঞ্জুমানে মোত্তাবেয়ীনে গাউছে মাইজভান্ডারী” সমাজ-সংস্কার ও নৈতিক উন্নয়ন মূলক সমাজ সংগঠক পদ্ধতির সফলতার উদ্দেশ্যে হানাফী মাযহাব এজমা ফতোয়ার ভিত্তিতে আমি যে ভাবে কামেল অলিউল্লাহ্‌র নির্দেশিত উত্তরাধীকারী গদীর সাজ্জাদানশীন সাব্যস্ত তদ্‌মতে আমার ছেলেদের মধ্যে যোগ্যতম ব্যক্তি সৈয়দ এমদাদুল হক মিঞাকে “সাজ্জাদানশীন” মনোনীত করিবার পর এই গ্রন্থটি তাহার হস্তে অর্পন করিলাম।”
সাজ্জাদানশীন এর আধ্যাত্মিক অবস্থানের প্রতি শাহানশাহ্‌ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী (কঃ) এর স্বীকৃতিঃ একদিন শাহানশাহ্‌ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী (কঃ) তাঁর পূর্ব বাড়ী থেকে গাউছিয়া আহমদিয়া মঞ্জিল আসেন। হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী (কঃ) আপন ছোট ভাই শাহ সুফী হযরত সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভান্ডারী (মঃ জিঃ আঃ) কে অছীয়ে গাউছুল আজম হযরত সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভান্ডারী (কঃ) এর চেয়ার বসার জন্য বলেন। মুর্শিদের প্রতি আদব রক্ষার্থে তিনি আপন মুর্শিদের চেয়ারে বসতে ইতস্ততঃ করতে থাকেন। কিন্তু বড় ভাই চেয়ারে বসার জন্য তাকে বারবার পীড়াপীড়ী করতে থাকেন।
একদিকে মুর্শিদের প্রতি সম্মান ও আদব রক্ষা অন্যদিকে বড় ভাইয়ের পীড়াপীড়ী এহেন অবস্থায় তিনি উপস্থিত ভগ্নিপতি অনুরোধ করেন তাঁর বাবা ও মুর্শিদকে পরিস্থিতি জানিয়ে দিক নির্দেশনা জানার জন্য।

হযরত সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভান্ডারী (কঃ) ঘঠনা শুনে তৎকালীন নায়েব সাজ্জাদানশীন হযরত সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভান্ডারী (মঃ জিঃ আঃ) কে তাঁর চেয়ারে বসতে বলেন। তখন তিনি চেয়ারে বসেন। হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী (কঃ) মোনাজাত করেন। এরপর খাদেম কে আদেশ করেন চেয়ারটি নিয়ে শাহী ময়দানের মাঝখানে রাখতে। খাদেম চেয়ারটিকে সেখানে নিয়ে রাখলে তিনি আবারও চেয়ারে বসতে বলেন। এবং মোনাজাত করেন।
হযরত সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভান্ডারী (কঃ) এ ঘঠনার রহস্য প্রকাশ করে বলেন হযরত সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভান্ডারী (মঃ জিঃ আঃ) এর রূহানী উত্তরাধীকারকে হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী (কঃ) এই ধরনের রূপক কাজের মাধ্যমে স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন।
মাইজভান্ডারী ত্বরিকার অনুসারীদের প্রতি বর্তমান সাজ্জাদানশীন এর দিক নির্দেশনাঃ বর্তমান সাজ্জাদানশীন হযরত সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভান্ডারী (মঃ জিঃ আঃ) আধ্যাত্মিক সাধনায় সফলতা লাভের জন্য শরীয়তের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণের প্রয়োজনীয়তার উপর জোরারোপ করেন। তিনি বায়াত প্রদানকালে মুরিদদের সবসময় বলেন, “শরীয়ত কে বাদ দিয়ে ত্বরিকত নাই”।
তিনি বায়াত প্রদানকালে মুরিদদের প্রথম যে বিষয়ের জন্য বলেন তা হচ্ছে নিয়মিত নামাজ পড়া; রোযা রাখা; সামর্থ্য থাকলে হজ্ব-যাকাত আদায় করা অর্থাৎ শরীয়ত পালন করা।

গাউছুল আজম শাহ্‌ সূফী সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী কেবলা ক্বাবা কাদ্দাছাল্লাহু ছিরহুল আজিজ (কঃ) এর পরিচয়

গাউছুল আজম শাহ্‌ সূফী সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী হলেন একজন সুফি সাধক ও মাইজভান্ডারী তরীকার প্রতিষ্ঠাতা। তিনি আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী নামেই বহুল পরিচিত। তার অনুসারীগণ যে সকল প্রচার-প্রকাশনা বাংলা, আরবি, উর্দু এবং ইংরেজি সহ বিভিন্ন ভাষায় ছাপিয়ে আসছে, তাতে তার নাম গাউছুল আজম হযরত মৌলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী কেবলা ক্বাবা কাদ্দাছাল্লাহু ছিরহুল আজিজ (কঃ) লিখতে দেখা যায়। এছাড়াও তিনি গাউছুল আজম, হযরত কেবলা, গাউছুল আজম মাইজভান্ডারী, বড় মৌলানা, খাতেমুল অলদ, শাঁই-এ-লিল্লাহ্ প্রভৃতি উপনামেও পরিচিত।


রওজা শরীফ


জন্ম :

আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী কেবলা ক্বাবা কাদ্দাছাল্লাহু ছিরহুল আজিজ (কঃ) ১৮২৬ সালে ১৫ জানুয়ারী (১ম মাঘ, ১২৩৩ বাংলা সন) চট্টগ্রাম শহর হতে ৪০ কিলোমিটার উত্তরে তৎকালীন প্রত্যন্ত মাইজভান্ডার গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সৈয়দ মতিউল্লাহ মাইজভান্ডারী ও মাতার নাম সৈয়দা খায়রুন্নেছা। তার পারিবারিক নাম ছিল সৈয়দ আহমদ উল্লাহ।

বংশ পরিচয় :
আহমদ উল্লাহর পুর্ব পুরুষ সৈয়দ হামিদ উদ্দিন, গৌড় নগরে ইমাম এবং কাজীর পদে নি্য়োজিত ছিলেন। তিনি গৌড় নগরে মহামারীর কারণে ১৫৭৫ সনে চট্রগ্রামের পটিয়া থানার কাঞ্চন নগরে বসতি স্হাপন করেন; সেখানে তার নামানুসারে হামিদ গাঁও নামে একটি গ্রাম আছে। তার এক পু্ত্র সৈয়দ আব্দুল কাদের ফটিকছড়ি থানার আজিমনগর গ্রা্মে ইমামতি উপলক্ষে এসে বসতি স্হাপন করেন। তার পুত্র সৈয়দ আতাউল্লাহ তৎ পুত্র সৈয়দ তৈয়বুল্লাহর মেজ় পুত্র সৈয়দ মতিউল্লাহ মাইজভাণ্ডার গ্রামে এসে বসতি স্হাপন করেন।
শিক্ষা জীবন :
আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী কেবলা ক্বাবা কাদ্দাছাল্লাহু ছিরহুল আজিজ (কঃ) গ্রামের মক্তবের পড়ালেখা শেষ করার পর ১২৬০ হিজরীতে উচ্চ শিক্ষার্জনের উদ্দেশ্যে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। তিনি ১২৬৮ হিজরীতে বিশেষ কৃতিত্বের সাথে পরীক্ষায় পাশ করেন। সেখানেই তিনি তৎকালীন সর্বোচ্চ পর্যায়ের শিক্ষা সমাপন করে ধর্মীয় নানা অনুষ্ঠানাদিতে আমন্ত্রিত অতিথি বা বক্তা হিসাবে যথেষ্ট সুনামের সাথে ধর্মীয় প্রচার-প্রচারণার কাজে লিপ্ত ছিলেন।
কর্ম জীবন :
তিনি শিক্ষা জীবন শেষে করে হিজরী ১২৬৯ সালে ব্রিটিশ শাসনাধীন অবিভক্ত ভারতের যশোর অঞ্চলের বিচার বিভাগীয় কাজী পদে যোগদান করেন এবং একই সঙ্গে মুন্সেফী অধ্যায়ন শুরু করেন। পরবর্তিতে ১২৭০ হিজরীতে কাজী পদে ইস্তফা দিয়ে তিনি কলিকাতায় মুন্সী বু আলী মাদ্রাসায় প্রধান মোদাররেছ হিসাবে যোগদান করেন। পরবর্তি সময়ে মুন্সেফী পরীক্ষায় ও তিনি প্রথম স্থান অধিকার করে ছিলেন।
আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী হাদিস, তাফসির, ফিকহ, মন্তেক, হিকমত, বালাগত, উছুল, আকায়েদ, ফিলছফা, ফারায়েজ সহ যাবতীয় বিষয়ে অত্যন্ত অভিজ্ঞ ছিলেন। আরবী, উর্দু, বাংলা ও ফারসি ভাষায় তিনি বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তৎকালীন সময়ে ওয়ায়েজ এবং বক্তা হিসাবে তার নামডাক বিশেষ ভাবে ছডিয়ে পড়ে। অল্প কিছু দিন পরই তিনি আধ্যাত্মিক জীবন যাপনে আত্ম নিয়োগ করেন। তখন হতে তিনি বাকি জীবন একজন সুফি সাধক হিসাবে অতিবাহিত করেন।
বেলায়ত অর্জন :
আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী কেবলা ক্বাবা কাদ্দাছাল্লাহু ছিরহুল আজিজ (কঃ) হযরত বড়পীর সৈয়দ আব্দুল কাদের জিলানী (কঃ)-এর বংশধর ও উক্ত তরিকার খেলাফত প্রাপ্ত সৈয়দ আবু শাহামা মুহাম্মদ ছালেহ আল কাদেরী লাহোরী (রঃ) নিকট বায়েত গ্রহনের মাধ্যমে বেলায়ত অর্জন করেন এবং সৈয়দ দেলওয়ার আলী পাকবাজ (রঃ) এর নিকট হতে এত্তাহাদী কুতুবিয়তের ক্ষমতা অর্জন করেন। তিনি দিনে দ্বীনি শিক্ষাদান ও রাতে এবাদত ও রেয়াজতের মাধ্যমে সময় কাটাতেন। এভাবে কঠোর সাধনার ফলে তিনি আধ্যাত্মিক জগতের সর্বোচ্চ বেলায়ত অর্জন করেছিলেন।
খলিফা :
আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী জীবদ্দশায় তাঁর সুফি তরীকার দীক্ষা সমাজে মানুষের মাঝে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে বহু সুফি প্রতিনিধি বা খলিফা নিয়োগ করেন বলে উল্লেখ রয়েছে। তন্মধ্যে ২০৪ খলিফার নাম ইতঃপূর্বে বেশ কয়েকটি প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক গণ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।সাংসারিক জীবন
আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী ১২৭৬ হিজরীতে ৩২ বছর বয়সে আজিম নগর নিবাসী মুন্সী সৈয়দ আফাজ উদ্দিন আহমদের কন্যা সৈয়দা আলফুন্নেছা বিবির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্ত বিয়ের ছয় মাসের মাথায় তাঁর স্ত্রী মারা যান। সেই বছরই তিনি পুনরায় সৈয়দা লুৎফুন্নেছা বিবিকে বিয়ে করেন। ১২৭৮ হিজরী সালে তাঁর প্রথম মেয়ে সৈয়দা বদিউন্নেছা বিবি জন্মগ্রহন করেন। কিন্তু মেয়েটি চার বছর বয়সে মারা যায়। এরপর তাঁর আরোও একটি ছেলে জন্মগ্রহন করে অল্প দিনের মধ্যে মারা যান। অতঃপর ১২৮২ হিজরীতে দ্বিতীয় পুত্র সৈয়দ ফয়জুল হক (রঃ) এবং ১২৮৯ হিজরী সালে দ্বিতীয় কন্যা সৈয়দা আনোয়ারুন্নেছা জন্মগ্রহন করেন। তাঁর দ্বিতীয় পুত্রও পিতার পুর্বে ইন্তেকাল করেন।

মৃত্যু :
আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী ১৯০৬ সালের ২৩ জানুয়ারি (১০ মাঘ, ১৩১৩ বঙ্গাব্দ) আশি বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। মাইজভান্ডারেই তিনি সমাহিত হন এবং তার কবরের উপর বর্তমানে আধুনিক স্থাপত্য শৈলী খচিত মাজার বিদ্যমান।
শিষ্যবৃন্দ :
সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারীর এ পর্যন্ত প্রায় ১৫৬ জন শিষ্যের নাম ঠিকানা এবং মাজার সম্পর্কে জানা যায়; যারা সারা বাংলাদেশ, বার্মা এবং পাকিস্তানে ছড়িয়ে আছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন - সৈয়দ গোলামুর রহমান, সৈয়দ আমিরুজ্জমান শাহ, আব্দুল আজিজ, মিয়া হোসাইন, সৈয়দ আমিনুল হক মাইজভান্ডারী, সৈয়দ ফয়জুল হক প্রমুখ।